সবার সামনে রাগারাগি নয় - Lakshmipur News | লক্ষীপুর নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Breaking


Post Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Friday, December 29, 2017

সবার সামনে রাগারাগি নয়

একটি বেসরকারি মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের কর্মী খালিদ হোসাইন (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ছয় বছর হলো পেশাজীবন নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমধ্যেই অফিসে বড় কর্তাদের রোষানলে পড়েন খালিদ। ছোটখাটো ভুলত্রুটির জন্যও অফিসে সবার সমানে বেশ অপদস্থ হয়েছেন। তাঁর অধীনেও ৯ জন কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের সামনেও এমন ঘটনা ঘটে। তিনি বললেন, ভুল হলে কথা শুনতে সমস্যা নেই। কিন্তু সবার সামনে সব পরিস্থিতে শুনলে সেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কর্মস্থলে নেতিবাচক আচরণ নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) বিবিএ প্রোগ্রাম চেয়ারম্যান রিদওয়ানুল হক এমন আচরণকে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের জন্য নেতিবাচক বলে মনে করেন। রিদওয়ানুল হক বলেন, প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাজের সমালোচনা করার অবশ্যই বিশেষ ধারা আছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাঁরা কর্তা পর্যায়ের ব্যক্তি, তাঁরা অধস্তনদের ওপর প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন। সবার সামনে রাগারাগি কিংবা ভিন্ন কোনো পরিবেশে নেতিবাচক আচরণ কর্মীদের মনে অসন্তোষ তৈরি করে। যেসব প্রতিষ্ঠানে এমন নেতিবাচকতার চর্চা আছে, সেখানে তরুণ মেধাবী কর্মীদের কাজের আগ্রহ থাকে না, দিন শেষে প্রতিষ্ঠানই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকাশ্যে রাগারাগি করা দক্ষতা নয়, দুর্বলতা
২০১৫ সালে ই-কর্মাস প্রতিষ্ঠান আমাজন ডটকম বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। বিভিন্ন দাপ্তরিক সভায় আমাজনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রভাব খাটাতেন আর কর্মীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে আমাজনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেফ বেজস ক্ষমা চেয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনার ঘোষণা দেন।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডিস ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক অ্যান্ডি মলিনস্কি লিখেছেন, ‘কর্মস্থলে কাজের সমালোচনা আর কর্মীদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার একটি ধরন (স্টাইল) আছে, যা প্রতিষ্ঠানের “সংস্কৃতি” সংজ্ঞায়িত করে। কর্মীদের ভুলত্রুটিকে কেন্দ্র করে হট্টগোল, তর্কাতর্কি করা, সবার সামনে বকাঝকা করা আধুনিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি হতে পারে না।’ অফিসে আলাদা ঘরে ডেকে নিয়ে কর্মীদের ভুলত্রুটি সম্পর্কে বলা যায়। এমনভাবে বলতে হবে, যেন অন্য কর্মীরা কিছুই টের না পায়। কর্মীদের খুব বড় ভুল কিংবা ব্যর্থতার জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিজেদের ওপর দায় নেওয়া শিখতে হয়। জাপান, সুইডেন, নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন চর্চা দেখা যায়। দক্ষ ব্যবস্থাপকের সেরা ৫টি গুণের একটি হচ্ছে দলের ভুলের দায় নিজে নিয়ে কর্মীদের অনুপ্রেরণা দেন। বন্ধুকে ছোট করবেন না শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বন্ধুদের আড্ডাতেও আমরা অন্যকে ছোট করার মতো কাজ করে থাকি। এ ধরনের আচরণে যে মানুষটিকে ছোট করা হচ্ছে, তিনি বেশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, যা হয়তো কারও সঙ্গে তিনি শেয়ারও করতে পারেন না। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলর ও প্রভাষক আয়েশা সিদ্দিকা জানান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় আমরা অনেকেই অন্যকে ছোট করে কথা বলি, যা কিন্তু আসলে বুলিংয়ের মতো অপরাধ। অন্যের মনে আঘাত দেওয়া কিংবা তার ওপর যেকোনোভাবেই মানসিক চাপ তৈরি করা একধরনের সামাজিক অন্যায় আপনি যদি কোনো আড্ডায় কিংবা বন্ধুমহলে এমন অন্যায় আচরণের শিকার হন, তাহলে বন্ধুদের বোঝানোর চেষ্টা করুন কিংবা শিক্ষকদের শরণাপন্ন হতে পারেন। বিভিন্ন ঘরোয়া পার্টি বা অনুষ্ঠানে এমন আচরণ কখনোই করবেন না। যাঁরা এমন আচরণ করছেন, তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন। বন্ধুর কথাবার্তার ধরন, হাঁটাচলার স্টাইল কিংবা পোশাক-আশাক নিয়ে নেতিবাচক কথা বললে আসলে নিজেকেই ছোট ও অসম্মান করা হয়। পরিবারে ইতিবাচক আচরণ করুন
সন্তানকে অতিথির সামনে কিংবা আত্মীয়স্বজনের সামনে বকাঝকা করেন অনেক বাবা-মা। যেসব শিশু এমন পরিবেশে বড় হয়, তারা অন্যকে সম্মান করার নৈতিক শিক্ষা পায় না, সহিষ্ণুতাও শেখে না। নিজেকে ছোট ভাবার কারণে এমন শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা পায়। আয়েশা সিদ্দিকা জানান, সন্তানের পরীক্ষার খারাপ ফলাফল কিংবা যেকোনো কারণেই হোক না কেন, সবার সামনে কখনোই বকবেন না কিংবা তুলনা করে কথা বলবেন না। এতে আসলে আপনার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়, যার কারণে সন্তান মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। ব্যর্থতা কিংবা ভুলত্রুটিতে সন্তানকে বোঝানোর চেষ্টা করুন একান্তে। আপনি আপনার সন্তানকে নিয়ে ভাবছেন, এমন ধারণা সন্তানের মনে প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দিন। পরিবারের এক সন্তানকে অন্য সন্তানের সামনে বকুনি দেওয়ার অভ্যাস থেকেও বিরত থাকুন। যেসব পরিবারে সন্তানকে অভিভাবকেরা প্রকাশ্যেই বকুনি দেন, সে পরিবারগুলোর মানসিক স্থিরতা বেশ ভঙ্গুর হয়। ইতিবাচকভাবে সমালোচনা একান্তে কথা বলুন: প্রকাশ্যে মেজাজ দেখানোর চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন। এতে কর্মীরা ইতিবাচকভাবে কাজ করতে উৎসাহ বোধ করেন। পরিবারের ক্ষেত্রে সন্তানকে একান্তে তার ভুলগুলো ধরিয়ে আলোচনা করুন। বন্ধুদের কোনো কিছু বলতে চাইলে একান্তে বুঝিয়ে বলুন। দূরত্ব তৈরি যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
ইতিবাচকভাবে সমালোচনা করুন: সন্তানকে ‘তোমার ফলাফল কেন খারাপ হয়েছে’, এমন বাক্যে বকুনি না দিয়ে ‘তোমার ভবিষ্যতে ফল যেন ভালো হয়। তুমি তো গণিতে ভালো, তাহলে কেন ইংরেজিতে ভালো করছ না?’, এভাবে ইতিবাচক উপায়ে কথা বলুন। প্রতিষ্ঠানে কর্মীকে কোনো ত্রুটি বা ভুলের সমালোচনা শুরু করুন এভাবে, আপনার কাজের মান বাড়ানোর জন্য আমার কিছু পরামর্শ আছে। আপনি কাজটি যেভাবে করেছেন, তা একটু অন্যভাবে করলে আমরা যা চাই, তা-ই করা সম্ভব কিন্তু! প্রশংসা বা ইতিবাচক বাক্য দিয়ে সমালোচনা বা ভুল ধরিয়ে দেওয়া শিখুন।
সমস্যা কোথায় তা খুঁজে বের করুন: কর্মক্ষেত্রে ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে আমিত্ব জাহিরের চেষ্টা করবেন না। কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা খুঁজে বের করুন। অনুসন্ধিৎসু মনন তৈরির মাধ্যমে সমস্যার সূত্র খুঁজে বের করুন।
নির্দিষ্ট বর্ণনা দিন: সন্তানকে বকুনি দেওয়ার সময় ‘তোমার ফল এর-ওর চেয়ে ভালো না কেন?’, এমন ধরনের বাক্য পরিহার করে ‘তোমার জ্যামিতিতে ভালো করতে হবে’ কিংবা ‘তোমার প্রতিদিন আরও দুই ঘণ্টা বেশি পড়া উচিত ছিল’, এমন কথা বলুন।
কীভাবে উন্নতি করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ দিন: প্রতিষ্ঠানে কর্মীর ভুলত্রুটিতে তাঁকে জবাবদিহির সুযোগ দিয়ে তাঁর কাজকে আরও উন্নত করা যায় কীভাবে, তা নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার চর্চা শুরু করুন। পরিবারের সন্তানের ভুল কীভাবে কমানো যায়, কিংবা পরীক্ষায় কীভাবে আরও ভালো করা যায়, তা সন্তানকে জানান।
নিয়মিত যোগাযোগের মধ্যে থাকুন: যেকোনো ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলার পরে নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। তাঁর উন্নতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কিংবা দলের নেতা হিসেবে নিয়মিত জানতে হবে আপনার সহকর্মীর অগ্রগতির বিষয়ে। সারা বছর সন্তানের খোঁজ রাখেন না, অথচ ফলাফলের দিন সন্তানকে বেধড়ক পিটুনি দেওয়া একটি সামাজিক অপরাধ। এতে সন্তানের সঙ্গে আপনার দূরত্ব তৈরি হয়। এমন নেতিবাচক আচরণ পরিহার করুন।

Post Top Ad

Responsive Ads Here